সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) বিকেলে সুদূর দক্ষিণ সুদানে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে কাপ্তান হিসেবে দায়িত্বরত অবস্থায় অকালে মৃত্যুবরণ করা বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং আর্টিফিসার-৩ (ইএ-৩) ট্রোম্যান খীসার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া তাঁর নিজ জন্মভূমিতে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় সম্পন্ন হয়েছে।
ধর্মীয় রীতি ও ভাবগাম্ভীর্যের আবহ ছড়িয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর একটি চৌকস দল তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করে। সালাম ও বিউগলের করুণ সুরের মধ্য দিয়ে এ সাহসী সৈনিকের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়। মরদেহে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করেন নৌবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, স্বজন, স্থানীয় প্রশাসন ও হাজারো এলাকাবাসী।
এর আগে সকালে নানিয়ারচরের রামহরিপাড়া এলাকায় নিথর দেহ বহনকারী গাড়ি পৌঁছালে প্রিয় মানুষকে এক নজর দেখতে ঢল নামে হাজারো পাহাড়ি-বাঙালি জনতার। কান্না আর আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে পুরো গ্রামের বাতাস। স্থানীয় বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরুদের উপস্থিতিতে সম্পন্ন হয় বিশেষ ধর্মীয় প্রার্থনা। পরে ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে শ্মশানে শেষকৃত্যানুষ্ঠান সম্পন্ন করে সমাহিত করা হয় বিশ্বশান্তির এই প্রহরীর মরদেহ।
অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শেষে নৌবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রয়াত বীর সৈনিকের স্ত্রী শ্রেয়া চাকমার হাতে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও জাতিসংঘের পতাকা, বিশেষ ক্যাপ এবং মেডেল আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে দেন। এ সময় অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে দুই শিশু কন্যাকে সুশিক্ষিত হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারি আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি একটি চাকরির আকুল আবেদন জানান ট্রোম্যান খীসার স্ত্রী।
উল্লেখ্য, গত ২০ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ সুদানে নিয়োজিত 'ব্যানএফএমইউ-১১' কন্টিনজেন্টে কর্তব্যরত অবস্থায় আকস্মিক বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে গুরুতর আহত হন ট্রোম্যান খীসা। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে দ্রুত রাজধানী জুবার ভারতীয় ফিল্ড হাসপাতালে ভর্তি করা হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশনে তাঁর অসামান্য ও অবিস্মরণীয় অবদানের কথা স্মরণ করে গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ প্রতিনিধি ও মিশন প্রধান। একই সাথে নৌবাহিনী প্রধান তাঁর এই অকালমৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানিয়েছেন।
১৯৮৭ সালে রাঙ্গামাটির নানিয়ারচর উপজেলার রামহরি পাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণকারী ট্রোম্যান খীসা ২০০৬ সালের ১ জুলাই বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে যোগদান করেছিলেন। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতেও বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকাকে উঁচুতে তুলে ধরেছিলেন তিনি। তাঁর এই বীরত্বগাথা প্রস্থানের মধ্য দিয়ে পরিবার ও নানিয়ারচরের আকাশে নেমে এসেছে আজীবন এক অপূরণীয় শূন্যতা।
মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, দুই শিশুকন্যাসহ অজস্র গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ানুষ্ঠানে নৌবাহিনীর সামরিক কর্মকর্তা, বেসামরিক প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
প্রতিবেদক: মো. জসিম উদ্দিন, রাঙ্গামাটি
