বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বামরাইল বাজারের সেই ঘটনাটি শুধুই এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য হয়ে থেমে থাকেনি; বরং বাবার প্রতি ছোট্ট কন্যা তুবার সেই স্বর্গীয় ভালোবাসাই শেষ পর্যন্ত অনিক শিকদারকে এনে দিল এক অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরার নতুন জীবন।
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত: ঘটনার পটভূমি বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বামরাইল বাজারে। গত ২৫ সেপ্টেম্বর (শুক্রবার) দিবাগত গভীর রাতে দোকানে চুরির চেষ্টার অভিযোগে অনিক শিকদার (সরদার) নামে ওই যুবককে আটক করে স্থানীয়রা। পরে তাকে বাজারের একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়। শনিবার সকালে বাবাকে এমন অপমানজনক ও অবরুদ্ধ অবস্থায় দেখে ছুটে আসে তার অবুঝ মেয়ে তুবা। বাবার অনাহারে থাকার কথা জানতে পেরে পাশের দোকান থেকে চা-রুটি কিনে নিজ হাতে বাবাকে খাওয়ায় সে। পরে স্থানীয়রা একটি মুচলেকা নিয়ে অনিককে তার অভিভাবকের জিম্মায় ছেড়ে দেয়। স্থানীয় উজিরপুর থানা পুলিশ খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে টিম পাঠানোর আগেই স্থানীয়রা বিষয়টি সমাধান করে তাকে মুক্তি দেয়।
তবে ঘটনার এখানেই শেষ নয়। মোবাইল ফোনে ধারণ করা নিষ্পাপ তুবার সেই ভালোবাসার ভিডিও মুহূর্তের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বাবার প্রতি সন্তানের এমন বিরল ও আবেগঘন মুহূর্ত দেশে জুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
চুরির পেছনে লুকিয়ে থাকা নির্মম বাস্তবতা: ভিডিওটি নজরে আসার পর এর নেপথ্যের সত্যানুসন্ধানে নামে সামাজিক মানবিক সংগঠন ‘ডব্লিউএবি ফাউন্ডেশন’ (WAB Foundation)। উজিরপুর থানা পুলিশের সহায়তায় সংগঠনটির একটি প্রতিনিধি দল সরাসরি ছুটে যায় ছোট্ট তুবা ও তার পরিবারের কাছে। অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে এক মর্মান্তিক সত্য—যাকে ‘চোর’ বলে গণধোলাই ও খুঁটিতে বাঁধার উপক্রম করা হয়েছিল, সেই অনিক শিকদার আদতে কোনো পেশাদার অপরাধী বা চোর নন; বরং এক কঠিন পরিস্থিতির নির্মম শিকার!
স্থানীয় সূত্র ও পরিবার সূত্রে জানা যায়, অনিক শিকদার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান ছিলেন। কিন্তু বাবার কঠিন ও ব্যয়বহুল দূরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসা চালাতে গিয়ে পুরো পরিবারটি একসময় ঘটিবাটি বিক্রি করে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। তীব্র পারিবারিক অভাব, মানসিক বিপর্যয় ও অসহায়ত্ব থেকে অনিক একপর্যায়ে মাদকের ভয়াল থাবায় জড়িয়ে পড়েন। পরবর্তীতে স্থানীয় এক মাদক সিন্ডিকেট তার এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাকে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়।
মেয়ের আকুতি ও আলোর পথে ফেরার অঙ্গীকার: ডব্লিউএবি ফাউন্ডেশন এবং পুলিশের উপস্থিতিতে অবুঝ শিশু তুবা শুধু একটি আকুতিই জানায়—তার বাবার জন্য যেন একটি সম্মানজনক ও সৎ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়, যেন তাকে আর কখনো মানুষের কটূক্তি শুনতে না হয়। অন্যদিকে, অপরাধ ও ভুলের অনুশোচনায় দগ্ধ বাবা অনিক শিকদারও নিজের ভুল স্বীকার করে স্বাভাবিক ও সৎ জীবনে ফিরে আসার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
নতুন জীবনের স্বপ্ন ও পুনর্বাসন: তুবার এই নিষ্পাপ ভালোবাসা এবং বাবার আলোর পথে ফেরার অদম্য ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে ডব্লিউএবি ফাউন্ডেশন। অনিক শিকদারকে সমাজে সম্মানের সাথে বাঁচার সুযোগ করে দিতে সংগঠনটির পক্ষ থেকে একটি নতুন 'অটোভ্যান' কিনে দেওয়া হচ্ছে, যাতে তিনি সম্মানজনক জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন। শুধু তাই নয়, অনিকের অন্ধকার পথ ঘুচিয়ে দেওয়া সেই মিষ্টি মেয়ে তুবার ভবিষ্যতের যাবতীয় পড়াশোনার খরচ ও দায়ভারও পুরোপুরি গ্রহণ করেছে ডব্লিউএবি ফাউন্ডেশন।
উজিরপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক এ মানবিক পুনরেকত্রীকরণ ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় পূর্ণ দেখাশোনা ও সার্বিক আইনি সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ লিখেছিলেন, “সমাজে অনেক খারাপ মানুষ আছে, কিন্তু একটাও খারাপ বাবা নেই।” অনিক শিকদার হয়তো জীবনের এক চরম গোলকধাঁধায় পড়ে ক্ষণিকের জন্য পথ হারিয়েছিলেন, কিন্তু মেয়ে তুবার নিঃস্বার্থ ও পবিত্র ভালোবাসাই আজ তাকে ফিরিয়ে আনল অন্ধকার থেকে আলোর মিছিলে। অপরাধের পেছনে লুকিয়ে থাকা মানুষের এমন অসহায়ত্ব চিহ্নিত করে পুনর্বাসন করতে পারলে সত্যিই বদলে যাবে আমাদের সমাজ।
প্রতিবেদক: বিশেষ প্রতিবেদন
