আজকের তারিখ লোড হচ্ছে...
সাম্প্রতিক:
আক্ষরিক নিউজ পোর্টালে আপনাকে স্বাগতম...
> শ্রদ্ধাঞ্জলি

শিশুমনের চিরসবুজ কারিগর আখতার হুসেন


বাংলা শিশুসাহিত্যের আকাশে কিছু লেখকের উপস্থিতি নক্ষত্রের মতো—তাঁরা কেবল একটি সময়ের পাঠকের জন্য লিখে থেমে থাকেন না; তাঁদের শব্দ, ছন্দ, কল্পনা ও চরিত্র প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে শিশুমনের সঙ্গে এক ধরনের আত্মীয়তা তৈরি করে। শিশুসাহিত্যিক আখতার হুসেন তেমনই একজন লেখক। ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তাঁর প্রয়াণে বাংলাদেশের শিশুসাহিত্য হারাল ছয় দশকের বেশি সময় ধরে শিশু-কিশোরদের জন্য নিরলসভাবে লিখে যাওয়া এক নিবেদিতপ্রাণ সাহিত্যিককে। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮১ বছর। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণসহ নানা জটিলতায় ঢাকার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

আখতার হুসেনের সাহিত্যজীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য তাঁর দীর্ঘস্থায়িত্ব এবং বহুমাত্রিকতা। তিনি শুধু ছড়াকার নন, শুধু শিশুকবি নন, শুধু গল্পকারও নন। ছড়া, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটিকা, জীবনী, অনুবাদ ও সম্পাদনা—সাহিত্যের নানা শাখায় তাঁর বিচরণ ছিল। প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক বলে সাম্প্রতিক একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি থেকে প্রকাশিত পাঁচ খণ্ডের ‘শিশু-বিশ্বকোষ’-এ সর্বাধিকসংখ্যক ভুক্তি লেখার কৃতিত্বও তাঁর। এই তথ্য তাঁর লেখার পরিমাণের পাশাপাশি তাঁর জ্ঞানবিস্তৃতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় বহন করে।

আখতার হুসেনের জন্ম ১৯৪৫ সালের ১ নভেম্বর। তাঁর পৈতৃক নিবাস নাটোরের লালপুর উপজেলার নুরুল্লাপুর গ্রামে। তাঁর বাবা টি আই এম সিকান্দার রেলওয়েতে চাকরি করতেন। ফলে শৈশব ও কৈশোরের একটি বড় অংশ কেটেছে দেশের নানা প্রান্তে—খুলনা, গফরগাঁও, কুলাউড়া প্রভৃতি অঞ্চলে। এই ঘুরে বেড়ানো শৈশব তাঁর সাহিত্যিক কল্পনাকে নিঃসন্দেহে বিস্তৃত করেছিল। প্রথম আলোর স্মৃতিচারণমূলক লেখায়ও তাঁর এই ভ্রাম্যমাণ শৈশবকে পরবর্তী শিশুসাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে দেখা হয়েছে। গফরগাঁওয়ে তাঁর সাহিত্যজীবনের সূচনা এবং কুলাউড়ায় প্রথম মুদ্রিত রচনা প্রকাশিত হয়।

তাঁর প্রথম বই ‘সমুদ্র অনেক বড়’ প্রকাশিত হয় ১৯৭০ সালে। নিজেই এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, বইটি প্রকাশের আনন্দে তিনি কেঁদে ফেলেছিলেন। বইটির পাণ্ডুলিপি দেখে দিয়েছিলেন সাহিত্যিক সত্যেন সেন। এই তথ্যটি আখতার হুসেনের সাহিত্যিক উত্তরাধিকারের একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক নির্দেশ করে। তাঁর সাহিত্যিক যাত্রার শুরুই ছিল এমন এক সময়, যখন বাংলাদেশের সমাজ-সংস্কৃতি গভীর রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। ফলে তাঁর শিশুসাহিত্য নিছক শিশুকে হাসানোর বা বিনোদন দেওয়ার সাহিত্য হয়ে থাকেনি; এর ভেতর দিয়ে তিনি জ্ঞান, কল্পনা, স্বাধীনতার চেতনা, মানবিকতা ও সামাজিক বোধের নানা বীজ ছড়িয়ে দিয়েছেন।

‘সমুদ্র অনেক বড়’ আখতার হুসেনের শিশুসাহিত্যের দর্শন বোঝার জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম আলোর একটি স্মৃতিচারণে এই গল্পের যে ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কুয়োর ব্যাঙ নিজের সীমিত পরিসরকেই পৃথিবীর শেষ সীমা মনে করে; পুকুর, বিল—প্রতিটি বৃহত্তর জগতের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পরও সে সমুদ্রের ব্যাপ্তি কল্পনা করতে পারে না। গল্পটির অন্তর্নিহিত অর্থ হলো—মানুষ যে সীমার মধ্যে আবদ্ধ থাকে, অনেক সময় তাকেই সমগ্র পৃথিবী বলে মনে করে; অথচ পৃথিবী তার ধারণার চেয়ে অনেক বড়।

এখানেই আখতার হুসেনের শিশুসাহিত্যের একটি মৌল বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে। তিনি শিশুকে ছোট করে দেখেননি। শিশুর বুদ্ধি, কৌতূহল ও কল্পনাশক্তিকে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাই তাঁর গল্পে শিক্ষা এসেছে গল্পের ভেতর দিয়ে, উপদেশের ভারে চাপা পড়ে নয়। শিশুকে তিনি প্রশ্ন করতে শিখিয়েছেন, পরিচিত জগতের বাইরে তাকাতে শিখিয়েছেন, নিজের চারপাশকে নতুন করে দেখতে শিখিয়েছেন। ‘সমুদ্র অনেক বড়’ শুধু একটি শিশুগল্প নয়; এটি শিশুমনের দিগন্ত প্রসারণের এক রূপক।

আখতার হুসেনের ছড়ার জগৎ অবশ্য আরও আলাদা। তাঁর ছড়ার সবচেয়ে বড় শক্তি প্রাঞ্জলতা, স্বাভাবিকতা ও কৌতুকবোধ। সাম্প্রতিক স্মৃতিচারণে তাঁকে ‘ছড়া-দাদু’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। শিশু-কিশোরদের মধ্যে তাঁর মজার ছড়া বিশেষ জনপ্রিয় ছিল। ‘হ্যাঁরে, খবরটা কি উড়ো?’-এর মতো ছড়ায় শব্দের খেলাচ্ছলে তিনি হাস্যরস সৃষ্টি করেছেন।

এই হাস্যরস তাঁর কাছে নিছক কৌতুক নয়। ছড়ার ছন্দ, শব্দের পুনরাবৃত্তি, অপ্রত্যাশিত শব্দ-সংযোগ এবং অতিরঞ্জন—এসবের মধ্য দিয়ে তিনি শিশুর ভাষাবোধকে সক্রিয় করেছেন। শিশু যখন কোনো ছড়া মুখস্থ করে, তখন সে শুধু কয়েকটি শব্দ মনে রাখে না; সে শব্দের সুর, ছন্দ, ধ্বনি ও অর্থের পারস্পরিক সম্পর্ক আবিষ্কার করে। আখতার হুসেনের ছড়ার এই স্বাভাবিক উচ্চারণযোগ্যতা এবং মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা তাঁর জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ।

তাঁর ‘উল্টোপাল্টা’ ও ‘হালচাল’ ছড়ার বই হিসেবে পরিচিত; ‘আমার দুটো ডানা’ ও ‘ও হাওয়া ও হাওয়া’ কিশোর কবিতার বই; ‘সমুদ্র অনেক বড়’ ও ‘রামধনুকের সাঁকো’ গল্পের বই; ‘ফ্রিডম ফাইটার’, ‘আয় আয়’ এবং ‘কর্ণকুসুম ও কালো পাখার প্রজাপতি’ উপন্যাস; ‘খেলাঘরের পুতুলগুলো’ নাটিকা এবং ‘ছোটদের চারণ কবি মুকুন্দদাস’ জীবনীধর্মী রচনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই বৈচিত্র্য প্রমাণ করে, আখতার হুসেন শিশুসাহিত্যকে কোনো একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে বন্দি রাখেননি। শিশুসাহিত্য তাঁর কাছে একটি পূর্ণাঙ্গ সাহিত্যভুবন—যেখানে হাসি আছে, বিস্ময় আছে, প্রকৃতি আছে, ইতিহাস আছে, দেশ আছে, মুক্তিযুদ্ধ আছে, বিজ্ঞান ও জ্ঞানের আকর্ষণ আছে, আবার আছে নাটকীয়তা ও কল্পনার স্বাধীনতা।

তাঁর লেখায় প্রকৃতি ও কল্পনার উপস্থিতিও লক্ষণীয়। সমুদ্র, আকাশ, পাখি, রূপকথা—এসব উপাদান তাঁর শিশুমনের জগতকে বিস্তৃত করেছে। কিন্তু তাঁর প্রকৃতি নিছক সৌন্দর্যের অলংকার নয়; প্রকৃতির ভেতর দিয়ে শিশুর কৌতূহল ও স্বাধীন কল্পনাকে তিনি উসকে দিয়েছেন। তাঁর বইয়ের নামগুলোর মধ্যেই সেই কল্পনার বিস্তার ধরা পড়ে—‘রামধনুকের সাঁকো’, ‘আমার দুটো ডানা’, ‘ও হাওয়া ও হাওয়া’। এগুলো শুধু নাম নয়; এগুলো শিশুমনের উড়ানের প্রতীক।

আখতার হুসেনের সাহিত্যিক সত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দেশ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। ১৯৭১ সালে তাঁর লেখনী স্বাধীনতার পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত তাঁর লেখা ‘স্বাধীন স্বাধীন দিকে দিকে জাগছে বাঙালিরা’ গানটি মুক্তিযুদ্ধের সময় মানুষের মধ্যে উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছিল বলে সাম্প্রতিক স্মৃতিচারণে উল্লেখ করা হয়েছে।

এখানে তাঁর শিশুসাহিত্যিক পরিচয়ের সঙ্গে সাংস্কৃতিক কর্মীর পরিচয়টি একসূত্রে যুক্ত হয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিশুকে কেবল আনন্দ দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; শিশুর মধ্যে দেশ, মানুষ, ইতিহাস ও মানবিকতার বোধও তৈরি করতে হয়। তবে তাঁর কাজের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো—তিনি শিশুদের সামনে এসব বিষয়কে কেবল বক্তৃতার আকারে হাজির করেননি। গল্প, ছড়া, গান, নাটক ও জীবনী—বিভিন্ন সাহিত্যরূপের মাধ্যমে বিষয়গুলোকে শিশুর গ্রহণযোগ্য করে তুলেছেন।

শিশুসাহিত্যিক হিসেবে তাঁর সাংগঠনিক ভূমিকা তাই তাঁর সাহিত্যকর্মের বাইরে নয়। তিনি বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ছিলেন এবং সংগঠনটির প্রথম দিকের বহু নাটক রচনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন। শিশুসংগঠন খেলাঘরের প্রথম সারির সংগঠক হিসেবেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। ছাত্র ইউনিয়ন ও খেলাঘরের সংগঠন সংগীত ‘আমরা তো সৈনিক, শান্তির সৈনিক’ তাঁর লেখা।

অর্থাৎ আখতার হুসেনের কাছে শিশুসাহিত্য ছিল শিশুর জন্য আলাদা করে বানানো কোনো কৃত্রিম সাহিত্য নয়; এটি ছিল সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে শিশুকে যুক্ত করার একটি সৃজনশীল মাধ্যম। এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে কেবল বইয়ের লেখক না রেখে শিশু-কিশোর সাংস্কৃতিক আন্দোলনেরও একজন কর্মী করে তুলেছিল।

তাঁর সাহিত্যিক পরিসরের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো জীবনী ও জ্ঞানভিত্তিক লেখালেখি। ‘ছোটদের চারণ কবি মুকুন্দদাস’ কিংবা ভাষাশহীদ আবদুল জব্বার ও কিশোর শহীদ মতিউর রহমানকে নিয়ে জীবনী রচনার মধ্য দিয়ে তিনি শিশুদের ইতিহাস ও ব্যক্তিত্বের সঙ্গে পরিচয় করিয়েছেন। তাঁর সম্পাদিত গ্রন্থের তালিকাতেও দেখা যায়—বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গল্প, দুই বাংলার কবিতায় বঙ্গবন্ধু, দুই বাংলার কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ, ছোটদের প্রিয় কবিতা, বাংলাদেশের বাছাই কিশোর কবিতা, বাংলা সাহিত্যের সেরা দেশপ্রেমের কবিতা ও গান, দাঙ্গাবিরোধী গল্প ইত্যাদি বিষয়ে তাঁর আগ্রহ ছিল।

এখানে তাঁর শিশুসাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষামূলক ভূমিকা স্পষ্ট হয়। তিনি শিশুকে শুধু ‘ভালো ছেলে’ হওয়ার উপদেশ দেননি; বরং সাহিত্য, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সমাজের সঙ্গে তার সম্পর্ক তৈরি করার চেষ্টা করেছেন। এই জায়গায় তাঁর শিশুসাহিত্য এক ধরনের সাংস্কৃতিক শিক্ষার ভূমিকা পালন করেছে।

তবে আখতার হুসেনের সাহিত্য মূল্যায়নে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন—শিশুসাহিত্যের মূল্যায়ন কেবল বড়দের সাহিত্যিক মানদণ্ডে করা যায় না। শিশুর জন্য লেখা সাহিত্যে ভাষার সরলতা, পুনরাবৃত্তি, ছন্দ, হাস্যরস, কৌতূহল, দৃশ্যমানতা ও মুখে বলার উপযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। যে ভাষা একজন প্রাপ্তবয়স্কের কাছে সরল বলে মনে হতে পারে, সেটিই শিশুর কাছে হতে পারে গভীর নান্দনিক অভিজ্ঞতার মাধ্যম। আখতার হুসেন এই শিশুমনস্তত্ত্বকে স্বাভাবিকভাবে ধারণ করেছিলেন।

তাঁর ভাষা ছিল সহজ, প্রাণবন্ত ও স্বাভাবিক—সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে এই বৈশিষ্ট্যের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর বহু ছড়া পাঠ্যপুস্তকেও স্থান পেয়েছে। পাঠ্যপুস্তকে স্থান পাওয়া নিছক জনপ্রিয়তার প্রমাণ নয়; এর অর্থ তাঁর ভাষা শিশুদের বয়সোপযোগী, স্মরণযোগ্য এবং শিক্ষামূলক ব্যবহারের উপযোগী বলে বিবেচিত হয়েছে।

আখতার হুসেনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলে নেওয়ার ক্ষমতা। তাঁর ‘গুগল’ নিয়ে লেখা ছড়ার উদাহরণটি এ ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আধুনিক প্রযুক্তি, ইন্টারনেট ও তথ্য অনুসন্ধানের মতো নতুন বাস্তবতাকেও তিনি ছড়ার বিষয় করেছেন। অর্থাৎ তিনি কেবল অতীতের শিশুর জন্য লেখেননি; সময়ের সঙ্গে শিশুর পৃথিবী যে বদলে যাচ্ছে, সেটিও তাঁর সৃষ্টিশীলতার মধ্যে জায়গা পেয়েছে।

এটি একজন দীর্ঘজীবী শিশুসাহিত্যিকের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গুণ। কারণ শিশুসাহিত্য যদি কেবল লেখকের নিজের শৈশবের স্মৃতিতে আটকে থাকে, তবে তা একসময় জাদুঘরের বস্তু হয়ে যেতে পারে। আখতার হুসেন নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে নতুন সময়ের বাস্তবতাকে যুক্ত করতে পেরেছিলেন বলেই তাঁর সাহিত্য দীর্ঘ সময় পাঠযোগ্য থেকেছে।

তাঁর লেখকজীবনের সঙ্গে সাংবাদিকতার সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। পেশাগত জীবনের শুরু সাংবাদিকতা দিয়ে; দেশের বিভিন্ন সংবাদপত্রে কাজ করেছেন এবং পরবর্তী সময়ে প্রথমা প্রকাশনে পাণ্ডুলিপি সম্পাদক হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা তাঁর ভাষাকে সম্ভবত আরও সংক্ষিপ্ত, সরল ও তথ্যনির্ভর করে তুলেছিল। শিশুসাহিত্যে এই গুণ বিশেষ কার্যকর—কারণ শিশুর মনোযোগ ধরে রাখতে অপ্রয়োজনীয় ভার এড়িয়ে চলা প্রয়োজন।

তাঁর সাহিত্যিক স্বীকৃতিও কম নয়। বাংলা একাডেমি পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক-শিশু একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, ভাষাশহীদ আবদুল জব্বার স্মৃতিপদক, মনিরউদ্দীন ইউসুফ সাহিত্য পুরস্কার, এম নুরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার, বজলুর রহমান স্মৃতিপদকসহ বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা তিনি পেয়েছেন। তিনি বাংলা একাডেমির ফেলোও ছিলেন।

তবে কোনো লেখকের গুরুত্ব শুধু পুরস্কারের তালিকায় নির্ধারিত হয় না। আখতার হুসেনের প্রকৃত মূল্যায়নের জায়গা তাঁর পাঠকসমাজ। একটি প্রজন্মের শিশু তাঁর ছড়া পড়ে হাসে, অন্য প্রজন্ম তাঁর গল্প পড়ে পৃথিবীকে নতুনভাবে চিনতে শেখে, আর কোনো তরুণ লেখক তাঁর বই পড়ে লেখক হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে—এই ধারাবাহিক পাঠ-প্রতিক্রিয়াই একজন শিশুসাহিত্যিকের স্থায়ী উত্তরাধিকার।

প্রথম আলোর একটি স্মৃতিচারণে এমনই এক ব্যক্তিগত পাঠ-অভিজ্ঞতার কথা উঠে এসেছে। লেখক জানিয়েছেন, স্কুলজীবনে সত্যেন সেনের ‘পাতাবাহার’-এর পাশাপাশি আখতার হুসেনের ‘সমুদ্র অনেক বড়’ তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল এবং লেখক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা জাগিয়েছিল। এই একটি স্মৃতিই আখতার হুসেনের সাহিত্যিক প্রভাবের গভীরতা বোঝার জন্য যথেষ্ট। শিশুর হাতে একটি বই দেওয়া আর একটি শিশুর মনে লেখক হওয়ার স্বপ্ন জাগানো—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার।

আখতার হুসেনের প্রয়াণ তাই কেবল একজন প্রবীণ লেখকের মৃত্যু নয়; এটি বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যের একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান। তাঁর ছয় দশকের বেশি সময়ের সাহিত্যজীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শিশুসাহিত্য কোনো ছোট সাহিত্য নয়। বরং একটি জাতির ভবিষ্যৎ পাঠক, ভবিষ্যৎ নাগরিক ও ভবিষ্যৎ কল্পনাশক্তির নির্মাণে শিশুসাহিত্যের ভূমিকা মৌলিক।

তিনি শিশুকে কখনো কেবল ‘শিশু’ হিসেবে দেখেননি; দেখেছেন সম্ভাবনাময় মানুষ হিসেবে। তাই তাঁর সমুদ্র সীমাহীন, তাঁর রামধনু সেতু হয়ে ওঠে, তাঁর দুটো ডানা আকাশের দিকে প্রসারিত হয়, তাঁর ছড়া হাসির দরজা খুলে দেয়, তাঁর গল্প প্রশ্ন করতে শেখায়, তাঁর মুক্তিযুদ্ধের গান স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করে, আর তাঁর বিশ্বকোষীয় কাজ জ্ঞানের দরজা খুলে দেয়।

আজ তাঁর শারীরিক উপস্থিতি নেই। কিন্তু শিশুর মুখে মুখে উচ্চারিত ছড়া, পুরোনো বইয়ের পাতায় থাকা গল্প, পাঠ্যবইয়ের পরিচিত পঙ্‌ক্তি, মুক্তিযুদ্ধের গানের স্মৃতি এবং নতুন কোনো শিশুর হাতে তুলে দেওয়া ‘সমুদ্র অনেক বড়’—এসবের মধ্য দিয়ে আখতার হুসেনের সাহিত্যিক জীবন চলমান থাকবে।

একজন শিশুসাহিত্যিকের সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত এটাই—তিনি চলে গেলেও শিশুরা তাঁর সঙ্গে কথা বলতে থাকে তাঁর বইয়ের মাধ্যমে। আখতার হুসেন সেই বিরল সৌভাগ্যের অধিকারী। তিনি ছিলেন শিশুমনের এক চিরসবুজ কারিগর; তাঁর নির্মিত শব্দের বাগানে আগামী দিনের শিশুরাও হয়তো খুঁজে পাবে হাসির পাখি, কৌতূহলের সমুদ্র, কল্পনার রামধনু এবং মুক্ত আকাশে উড়ে যাওয়ার দুটো ডানা।


লেখক পরিচিতি: কবি, প্রকাশক, সংগঠক

লেখক: আরিফ নজরুল

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন