আজকের তারিখ লোড হচ্ছে...
সাম্প্রতিক:
আক্ষরিক নিউজ পোর্টালে আপনাকে স্বাগতম...
> নোবেল

শব্দ ও স্মৃতির ধ্রুপদী বুনন: সাহিত্যে নোবেল জয়ী অ্যান কারসন

মহাকালের ধ্রুপদী ভাবনার সাথে আধুনিক চেতনার মেলবন্ধন ঘটিয়ে ২০২৬ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার জয় করলেন কানাডীয় কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক অ্যান কারসন। গত ৮ অক্টোবর ২০২৬, স্টকহোলমের সুইডিশ একাডেমি এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারের বিজয়ী হিসেবে ৭৬ বছর বয়সী এই সাহিত্যিকের নাম ঘোষণা করে। একাডেমি তাদের বিবৃতিতে উল্লেখ করে, "ধ্রুপদী সাহিত্যের পুনর্পাঠ এবং সমকালীন সাহিত্যের আঙ্গিক নিয়ে সাহসী ও উদ্ভাবনী পরীক্ষা-নিরীক্ষার স্বীকৃতিস্বরূপ" তাঁকে এই সম্মানে ভূষিত করা হলো। হাঙ্গেরীয় কথাসাহিত্যিক লাসলো ক্রাসনাহোরকাই-এর পর বিশ্বসাহিত্যের সর্বোচ্চ এই সিংহাসনে বসলেন কারসন। পুরস্কারের অর্থমূল্য হিসেবে তিনি পাবেন ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা।

"ওরা সবাই পাগল!" — নোবেলের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া

পুরস্কার ঘোষণার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় স্বভাবসুলভ রসিকতা ও অকপটতায় আইসল্যান্ডের গণমাধ্যম ‘আরইউভি’ (RUV)-কে কারসন বলেন, "পাগলামি! আমার মনে হয় ওরা সবাই পাগল... তবে হ্যাঁ, আপনারা তো জানেনই, এটা সত্যিই একটা পাগলামি!" সুইডিশ একাডেমির স্থায়ী সচিব যখন তাঁকে ফোন করেন, তখন তিনি আইসল্যান্ডে বসে শান্ত বাতাসের শব্দ শুনছিলেন। পুরস্কার প্রাপ্তির পর তিনি মৃদু হেসে বলেন, "এখন অন্তত আমার বইয়ের প্রচ্ছদে একটা নোবেলের স্টিকার জুড়বে!"

ধ্রুপদী প্রজ্ঞায় আধুনিক রূপান্তর

১৯৫০ সালে কানাডার টরন্টোতে জন্ম নেওয়া অ্যান কারসন মূলত একজন গ্রিক ধ্রুপদী সাহিত্যের পণ্ডিত ও অধ্যাপক। তবে প্রথাগত গবেষণার গণ্ডি পেরিয়ে তিনি প্রাচীন গ্রিক পুরাণ ও সাহিত্যকে যেভাবে আধুনিক কবিতার ফ্রেমে বন্দি করেছেন, তা বিশ্বসাহিত্যে বিরল। কবি, প্রাবন্ধিক, সমালোচক ও অনুবাদক—বহুমাত্রিক এই পরিচয়ে তিনি গত কয়েক দশক ধরে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
কারসনের সাহিত্যকর্মের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো তার ঘরানা-হীনতা (Genre-defying nature)। তিনি একই সাথে কবিতা, গদ্য এবং নাটকের সীমারেখা মুছে দিয়ে নতুন এক সাহিত্যশৈলী তৈরি করেছেন। কবিতা সম্পর্কে তাঁর ভাবনাও প্রথাগত নয়; তিনি মনে করেন দীর্ঘ গদ্যের চেয়ে আধুনিক দ্রুতগতির জীবনের সাথে কবিতাই বেশি মানানসই। তিনি বলেন, "আমি একটি কবিতা তৈরি করাকে একটি বস্তু তৈরির মতো মনে করি। আমি এগুলোকে লেখার চেয়ে ড্রয়িং বা ছবি হিসেবেই বেশি দেখি, যা ভাষার মাধ্যমে স্পর্শ করা যায়।"
অ্যান কারসন: এক নজরে জীবনপঞ্জি

  • ১৯৫০ - টরন্টোতে জন্ম। বাবা ব্যাংক কর্মকর্তা হওয়ায় শৈশবে বহু শহর বদল।
  • ১৯৮১ - টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রিক ধ্রুপদী সাহিত্যের ওপর পিএইচডি অর্জন।
  • ১৯৮৬ - প্রথম তাত্ত্বিক গ্রন্থ 'Eros the Bittersweet' প্রকাশ ও সাহিত্যমহলে আলোড়ন।
  • ১৯৯৮ - কালজয়ী পদ্য-উপন্যাস 'Autobiography of Red' প্রকাশ, যা তাঁকে বিশ্বখ্যাত করে।
  • ২০০১ - 'The Beauty of the Husband'-এর জন্য প্রথম নারী হিসেবে 'টি এস এলিয়ট প্রাইজ' লাভ।
  • ২০২২ - আইসল্যান্ডের নাগরিকত্ব গ্রহণ (বর্তমানে আইসল্যান্ড ও আমেরিকায় বসবাস করেন)।
  • ২০২৪ - পার্কিনসন্স রোগে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য প্রকাশ, যা তাঁর লেখার গতিকে কিছুটা ব্যাহত করে।
  • ২০২৬ - ধ্রুপদী ও সমকালীন সাহিত্যের মেলবন্ধনের অনন্য স্বীকৃতিস্বরূপ সাহিত্যে নোবেল লাভ। 

উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি ও সাহিত্যিক যাত্রা

অ্যান কারসনের দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে অসংখ্য পাঠকপ্রিয় ও সমালোচক-নন্দিত গ্রন্থ রয়েছে। তাঁর লেখার মূল অনুপ্রেরণা প্রাচীন গ্রিক মহাকবি হোমারের 'ওডিসি' হলেও তিনি আধুনিক সাহিত্যের বাঁকবদলেও সমান আগ্রহী। ফরাসি লেখক মার্সেল প্রুস্তের 'ইন সার্চ অব লস্ট টাইম' পড়ার পর তাঁর যে ঘোর তৈরি হয়েছিল, তা থেকে তিনি লিখেছিলেন বিখ্যাত বই 'দ্য আলবার্টিন ওয়ার্কআউট'। এছাড়া ইউরিপিদিসের প্রাচীন গল্পকে আধুনিক ভাষার আদলে গ্রাফিক ফরম্যাটে রূপ দিয়ে ২০২১ সালে তিনি প্রকাশ করেন 'দ্য ট্রোজান উইমেন'।
হলিউড তারকা ব্রি লারসনের অভিনয়ে লন্ডনের মঞ্চে মঞ্চস্থ হয়েছে কারসন অনূদিত সোফোক্লিসের বিখ্যাত নাটক 'ইলেকত্রা'। নোবেল কমিটির মতে, দৃশ্যশিল্পী, নৃত্য পরিচালক ও থিয়েটার পরিচালকদের সাথে তাঁর এই যৌথ কাজগুলোই সাহিত্য নিয়ে তাঁর প্রচলিত নিয়ম ভাঙার স্বাধীনতার প্রমাণ দেয়।

গ্রন্থ আলোচনা: পুরাণ ও আধুনিকতার কোলাজ ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড’

অ্যান কারসনের নোবেল জয়ের পর যে বইটি নিয়ে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে, তা হলো ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত তাঁর পদ্য-উপন্যাস 'Autobiography of Red'। এটি মূলত প্রাচীন গ্রিক কবি স্টেসিকোরসের একটি খণ্ডিত কবিতার আধুনিক পুনর্নির্মাণ।
  • মূল উপজীব্য: গ্রিক পুরাণে 'গেরিয়ন' (Geryon) নামের একটি লাল ডানাওয়ালা দানব ছিল, যাকে বীর হারকিউলিস হত্যা করেছিলেন। কারসন এই প্রাচীন মিথকে টেনে এনেছেন আধুনিক যুগের পটভূমিতে। এখানে গেরিয়ন কোনো হিংস্র দানব নয়, বরং সে একজন সংবেদনশীল তরুণ শিল্পী ও আলোকচিত্রী, যে তার নিজের ভেতরে এক অদ্ভুত বিচ্ছিন্নতা আর লাল ডানা নিয়ে বেঁচে আছে।
  • কেন এটি অনন্য: কারসন এই বইটিতে কবিতা এবং উপন্যাসের দেয়াল ভেঙে চুরমার করে দিয়েছেন। হারকিউলিসের সাথে গেরিয়নের প্রেম, প্রত্যাখ্যান এবং নিজের আত্মপরিচয় খোঁজার মনস্তাত্ত্বিক লড়াইকে তিনি যেভাবে ছন্দে ও গদ্যের মিশ্রণে ফুটিয়ে তুলেছেন, তা এক কথায় জাদুকরী। এটি কেবল একটি গল্প নয়, বরং আধুনিক মানুষের একাকীত্ব, শৈল্পিক আকুতি ও রূপান্তরের এক মহাকাব্যিক দলিল। নোবেল কমিটির দৃষ্টিতে কারসনের এই সাহসিকতাই তাঁকে সমকালীন সাহিত্যের অগ্রগণ্য করে তুলেছে।

বৈশ্বিক আনন্দ ও শেষ কথা

নোবেল জয়ের পর কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি কারসনের এই অর্জনকে কানাডার জন্য এক গর্বের মুহূর্ত হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন, "তিনি প্রাচীন গল্পগুলোকে আধুনিক পাঠকদের কাছে নতুনভাবে তুলে ধরেছেন এবং সাহিত্য নিয়ে আমাদের ভাবনার জগৎকে বদলে দিয়েছেন।"
প্রাচীন গ্রিসের ট্র্যাজেডি আর আধুনিক জীবনের বিচ্ছিন্নতাকে এক সুতোয় বেঁধে অ্যান কারসন প্রমাণ করলেন, সত্যিকার সাহিত্য সময়ের সীমানা মানে না। সুইডিশ একাডেমির এই সঠিক ও সাহসী সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে তাঁর কালজয়ী সৃষ্টিগুলোকে সাধারণ পাঠকদের কাছে আরও ব্যাপকভাবে পৌঁছে দেবে।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন