রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) সকালে মোংলা উপজেলার নারিকেলতলা নদীপাড়ে ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’ (ধরা), পশুর রিভার ওয়াটারকিপার, উত্তরণ এবং ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে দিনব্যাপী নানামুখী কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
এবারের বিশ্ব নদী দিবসের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—‘বন বাঁচলে নদী বাঁচবে, নদী বাঁচবে পানি বাঁচবে, পানি বাঁচলে জীবন বাঁচবে’।
কর্মসূচির অংশ হিসেবে সকাল সাড়ে ১০টায় নারিকেলতলা নদীপাড়ে ‘নদী বাঁচাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, এখনই’ শীর্ষক এক পথসভা, আলোচনা ও মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন ‘ধরা’-র কেন্দ্রীয় নেতা ও পশুর রিভার ওয়াটারকিপার মো. নূর আলম শেখ।
আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে মো. নূর আলম শেখ বলেন, "আমাদের নদী-প্রকৃতি, সুপেয় পানি, বন-জঙ্গল ও কৃষিভূমির উর্বরতা রক্ষা করতে হলে কালবিলম্ব না করে দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর নিশ্চিত করতে হবে।" তিনি আরও উল্লেখ করেন, রামপাল কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের ছাই, নির্গত গরম পানি ও কয়লা-সংক্রান্ত বিষাক্ত বর্জ্য পশুর নদীসহ বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন সংলগ্ন নদী ও খালের জলজ জীববৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলছে। ফলে নদী, জেলেদের জীবন-জীবিকা ও মৎস্যসম্পদ রক্ষায় জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা পুরোপুরি কমিয়ে আনার জোর দাবি জানান তিনি।
উত্তরণের ফিসনেট প্রকল্পের খুলনা অঞ্চলের অ্যাডভোকেসি অফিসার মো. মিজানুর রহমান বলেন, "উচ্চ আদালত নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ বা আইনি ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। সুতরাং যেকোনো মূল্যে নদীর অবৈধ দখল ও শিল্পদূষণ বন্ধ করতে হবে।" একই সাথে নদীতে অবৈধ মৎস্য আহরণ বন্ধের উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি প্রান্তিক জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান ও জীবিকার সুব্যবস্থা করার আহ্বান জানান তিনি।
জেলে সমিতি ও স্থানীয় পরিবেশবাদী প্রতিনিধিরা সুন্দরবন ও তৎসংলগ্ন জলাশয়গুলোকে কয়লা ও শিল্পবর্জ্যের দূষণ থেকে মুক্ত রাখার আকুল আবেদন জানান। পরিবেশকর্মী রাফিয়া জাহান মিশু তাঁর বক্তব্যে বলেন, "নদীপাড়ের মানুষের জীবনযাত্রা ও পরিবেশ ভালো থাকলে নদীও ভালো থাকবে। আর নদী বেঁচে থাকলেই বাঁচবে বাংলাদেশ।"
কর্মসূচির প্রধান আকর্ষণ ছিল মোংলা নদীতে শিশুদের ফুল ছিটানো ও প্রতীকী কাগজের নৌকা ভাসানো। আলোচনা সভা ও মানববন্ধনের পূর্বে কোমলমতি শিশুরা নদীর প্রতি তাদের ভালোবাসা ও সচেতনতার বার্তা ছড়িয়ে দিতে নদীতে সতেজ ফুল ছিটিয়ে দেয় এবং নদীর গুরুত্ব তুলে ধরতে ভাসিয়ে দেয় হরেক রঙের কাগজের নৌকা। মূল আলোচনা শেষে মোংলা নদীতে স্থানীয়দের গণগোসল, সাঁতার কাটা ও ঐতিহ্যবাহী হাঁস ধরা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়, যা উপস্থিত শত শত দর্শক উপভোগ করেন।
এর আগে, সকাল সাড়ে ৯টায় মোংলা উপজেলার নদ-নদী রক্ষা, জলজ প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও স্থানীয় জেলে সম্প্রদায়ের জীবনমান সুরক্ষার সুনির্দিষ্ট দাবি সংবলিত একটি স্মারকলিপি মোংলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শারমিন আক্তার সুমীর নিকট হস্তান্তর করেন পরিবেশবাদী সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উত্তরণের মনিটরিং অফিসার মো. আনোয়ার হোসেন, মোংলা এরিয়া ম্যানেজার মো. মোখলেছুর রহমান, ইয়ুথ ফর সুন্দরবনের প্রতিনিধি সোহেল রানা, মোহাম্মদ শাহীন খলিফা এবং স্থানীয় জেলে সমিতির শীর্ষনেতা বিদ্যুৎ মণ্ডল ও আব্দুর রশিদ হাওলাদারসহ এলাকার সর্বস্তরের মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
প্রতিবেদক: ম.ম. রবি ডাকুয়া, বাগেরহাট
